শিল্প খাতে চাহিদা কমার প্রভাব

লবণের উৎপাদন ৬২% কমে যাওয়া সত্ত্বেও মাঠ ও মিল পর্যায়ে দরপতন

চলতি মৌসুমে দেশে লবণের উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

চলতি মৌসুমে দেশে লবণের উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তা সত্ত্বেও মাঠ ও মিল পর্যায়ে অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে। মূলত আগের মৌসুমের অবিক্রীত লবণ মজুদ থাকার পাশাপাশি দেশের শিল্প খাতে এর চাহিদা অর্ধেকে নেমে আসায় উৎপাদন কম হলেও নিত্য ও শিল্প খাতে পণ্যটির বাজার নিম্নমুখী বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, চলতি মৌসুমে দেশে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন। গত নভেম্বরে মৌসুমের শুরুতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ৬৯ হাজার ১৯৮ একর জমি চাষের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জমিতে মোট ৪১ হাজার ৩৫৫ জন চাষীর উৎপাদনে নামার কথা ছিল। কিন্তু মৌসুম শুরুর পর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ১০ শতাংশ চাষী মাঠে নামেননি।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জানিয়েছে, চলতি মৌসুমের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৯৮ হাজার ৪১২ টন, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬২ শতাংশ কম। কিন্তু চাহিদা কমে যাওয়ায় মাঠ ও বাজারে মণপ্রতি দাম কমেছে ২০ টাকা। গত বছরের একই সময়ে দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৬১ হাজার ৫১৩ টন।

দৈনিক উৎপাদন হিসাব অনুযায়ী, ১০ ফেব্রুয়ারি একদিনে দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছে ৮ হাজার ১৫ টন লবণ। বর্তমানে বাজারদর অনুযায়ী মাঠে মণপ্রতি ২২০ বা কেজিপ্রতি ৪৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও গত বছর একই সময়ে মাঠে মণপ্রতি লবণ বিক্রি হয়েছিল ২৪০ টাকায়। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা কম থাকা ও আমদানির ঘোষণার কারণে অনিশ্চয়তায় দরপতন ঘটেছে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছর দেশের ২৪৭টি মিলকে মোট এক লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে ২৩১টি প্রতিষ্ঠান ৪২৯ দশমিক ১৮ টন করে আমদানির চূড়ান্ত অনুমতি পায়। তবে আগের অবিক্রীত লবণ মজুদ থাকায় সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানই আমদানির ঋণপত্র খোলেনি। অনেক মিল মালিক সময়সীমা বৃদ্ধির আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত আমদানি স্থগিত কিংবা বাতিল করার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ কারণে মাঠ পর্যায়ে এখনো ১০ শতাংশ চাষী লবণের মাঠে নামেননি।

বিসিক সূত্রে জানা যায়, দেশে উৎপাদিত লবণের প্রায় ৫০ শতাংশ শিল্প খাতে ব্যবহৃত হয়। বাকি অংশ প্রক্রিয়াজাত করে ভোজ্যলবণ হিসেবে বাজারজাত করা হয়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের অনেক শিল্প বিশেষত টেক্সটাইল খাতে লবণের চাহিদা কমে গেছে। এ কারণে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন সত্ত্বেও পূর্ববর্তী বছরের প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন লবণ বাজারে মজুদ রয়েছে।

জানতে চাইলে কক্সবাজার লবণ সেলের প্রধান ও বিসিকের উপ মহাব্যবস্থাপক আবু জাফর ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় এবার দিনভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী লবণ উৎপাদন হচ্ছে না। বিশেষত বাজারে দাম কম থাকায় অনেক চাষীও মাঠে নামেননি। এরপরও আমরা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী লবণ উৎপাদনের বিষয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

দেশের অন্যতম লবণ বিপণন কেন্দ্র চাক্তাইয়ের মেসার্স লাল মিয়া সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী মো. আসাদ আসিফ বণিক বার্তাকে জানান, গত দেড় বছরে দেশে অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় চালু কারখানাগুলোর উৎপাদনও কমেছে। ফলে শিল্প খাতে লবণের চাহিদা কমে গিয়ে দেশে লবণের অতিরিক্ত মজুদ দেখা দিয়েছে। এছাড়া মৌসুম শুরুর পর বিরূপ আবহাওয়ায় উৎপাদনও আশানুরূপ হচ্ছে না। কিন্তু দেশব্যাপী লবণের চাহিদা না থাকায় দাম কমে গেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে শিল্পমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে লবণের চাহিদা বৃদ্ধি না হলে খাতটির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

আরও